বাগেরহাট প্রতিনিধি:
শিকারিদের পাতা ফাঁদে আটকা পড়ে আহত হওয়ার পর দীর্ঘ ছয় মাস চিকিৎসা ও পুনর্বাসন শেষে সুন্দরবনে অবমুক্ত করা সেই বাঘিনীর এক মাসেও কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। তার গতিবিধি পর্যবেক্ষণে প্রায় ৮ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বসানো হয়েছে ৪০টি স্বয়ংক্রিয় ট্র্যাপ ক্যামেরা। তবে এখন পর্যন্ত কোনো ক্যামেরাতেই ধরা পড়েনি বাঘিনীটির ছবি। বিষয়টি নিয়ে বন বিভাগ ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের মধ্যে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ।
গত ১২ জুলাই সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের আন্ধারমানিক ইকোট্যুরিজম কেন্দ্রসংলগ্ন বনাঞ্চলে বাঘিনীটিকে অবমুক্ত করা হয়। যে স্থান থেকে তাকে উদ্ধার করা হয়েছিল, তার থেকে প্রায় ২০ থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরের বনাঞ্চলে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। অবমুক্তির পরপরই প্রায় ১৫০ মিটার এলাকায় বাঘিনীটির পায়ের ছাপ পাওয়া গিয়েছিল। এতে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছিল, সে স্বাভাবিকভাবেই বনের ভেতরে চলাচল করছে।
এর আগে চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের শরকির খালসংলগ্ন এলাকায় হরিণ শিকারিদের পাতা ফাঁদে আটকা পড়ে বাঘিনীটি আহত হয়। বন বিভাগের সদস্যরা তাকে উদ্ধার করে খুলনার বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের পুনর্বাসন কেন্দ্রে নিয়ে যান। সেখানে প্রায় ছয় মাস ধরে চিকিৎসা ও নিবিড় পরিচর্যার পর বাঘিনীটি সুস্থ হয়ে ওঠে।
বনে ফেরানোর আগে বাঘিনীটির শারীরিক সক্ষমতা ও স্বাভাবিকভাবে শিকার ধরার ক্ষমতাও পর্যবেক্ষণ করা হয়। বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতেই তাকে আবার প্রাকৃতিক পরিবেশে ফিরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
৪০ ক্যামেরায় অন্য বাঘ, নেই অবমুক্ত বাঘিনী
বাঘিনীটির অবস্থান শনাক্ত করতে প্রথমে আন্ধারমানিক এলাকার প্রায় ৮ কিলোমিটারজুড়ে ২০টি স্বয়ংক্রিয় ক্যামেরা বসানো হয়। পরে শ্যালনদীর পূর্বপাড় ও জয়মনি এলাকায় আরও ২০টি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়। বন বিভাগ নিয়মিত এসব ক্যামেরার ফুটেজ পর্যালোচনা করছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত ক্যামেরাগুলোতে অন্য তিনটি বাঘের উপস্থিতি ধরা পড়লেও অবমুক্ত করা বাঘিনীটির কোনো ছবি পাওয়া যায়নি।
এ অবস্থায় বাঘিনীটি বেঁচে আছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে ক্যামেরায় ছবি না পাওয়াকে বাঘিনীটির মৃত্যুর প্রমাণ হিসেবে দেখছে না বন বিভাগ। কারণ একটি পূর্ণবয়স্ক বাঘ সাধারণত ৩০ থেকে ৪০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় বিচরণ করতে পারে। ফলে বাঘিনীটি ক্যামেরার আওতাধীন এলাকা ছেড়ে অন্য এলাকায় চলে গিয়ে থাকতে পারে।
একই এলাকায় অন্য বাঘের উপস্থিতি
বন বিভাগের পর্যবেক্ষণে আন্ধারমানিকের গভীর বনে স্থাপন করা ক্যামেরায় ইতোমধ্যে তিনটি বাঘের ছবি ধরা পড়েছে। ছবিগুলো বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত হওয়া গেছে, এগুলোর কোনোটি অবমুক্ত করা বাঘিনীটি নয়। বরং ওই এলাকায় অন্য বাঘের উপস্থিতি থাকায় অবমুক্ত বাঘিনীটি প্রতিযোগিতা এড়িয়ে অন্য এলাকায় সরে যেতে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।
সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, অবমুক্তির পর বাঘিনীটির পায়ের ছাপ পাওয়া গিয়েছিল। শুরুতে কিছুটা দুর্বল মনে হলেও পরবর্তী সময়ে পাওয়া স্পষ্ট পায়ের ছাপ দেখে তাকে স্বাভাবিক বলেই মনে হয়েছিল। এখন ক্যামেরায় তার ছবি না পাওয়ায় আরও বিস্তৃতভাবে নজরদারি করা হচ্ছে।
আবারও ৪০ ক্যামেরা পর্যবেক্ষণ
বন বিভাগ জানিয়েছে, বাঘিনীটির অবস্থান নিশ্চিত করতে শিগগিরই ৪০টি ট্র্যাপ ক্যামেরার ফুটেজ আবারও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে। পাশাপাশি তার সম্ভাব্য বিচরণ এলাকার ওপরও নজরদারি রাখা হচ্ছে। বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, ক্যামেরায় ধরা না পড়া মানেই বাঘিনীটি মারা গেছে—এমন সিদ্ধান্তে এখনই পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
তবে দীর্ঘ ছয় মাস চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের পর বনে ফিরে যাওয়া বাঘিনীটি প্রাকৃতিক পরিবেশে কতটা সফলভাবে মানিয়ে নিতে পেরেছে, শিকার করতে পারছে কি না এবং কোথায় বিচরণ করছে—এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে বন বিভাগের নজরদারি আরও জোরদার করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের দৃষ্টিকোণ থেকেও ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আহত একটি রয়েল বেঙ্গল টাইগারকে চিকিৎসা দিয়ে পুনরায় সুন্দরবনে ফিরিয়ে দেওয়ার ঘটনাটি দেশের বাঘ সংরক্ষণে একটি উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এখন বন বিভাগের পাশাপাশি প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণীপ্রেমীদের প্রত্যাশা—সুন্দরবনের গহিনে নিরাপদে থাকা সেই বাঘিনীটির সন্ধান খুব শিগগিরই মিলবে।
Leave a Reply