জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশের উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর বাস্তব অভিজ্ঞতা, স্থানীয় পর্যায়ে অভিযোজন কার্যক্রম এবং জলবায়ু ন্যায়বিচারের দাবি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তুলে ধরতে জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন কপ-৩১-এ অংশগ্রহণ করছে বাংলাদেশের বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা লোকাল এনভায়রনমেন্ট ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড অ্যাগ্রিকালচারাল রিসার্চ সোসাইটি (লিডার্স)।
আগামী ৯ থেকে ২০ নভেম্বর ২০২৬ তারিখে তুরস্কের আনতালিয়ায় অনুষ্ঠিতব্য এ আন্তর্জাতিক সম্মেলনে লিডার্সের তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল অংশগ্রহণ করছে।
প্রতিনিধিদলে রয়েছেন সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক মোহন কুমার মণ্ডল, পরিচালক (কর্মসূচি) এ.বি.এম. জাকারিয়া এবং প্রকল্প কর্মকর্তা ইভানা আফরিন। সম্মেলনজুড়ে তাঁরা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আলোচনা, অভিজ্ঞতা বিনিময়, যোগাযোগ স্থাপন এবং দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে অংশ নেবেন।
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা, অভিযোজন কৌশল, স্থানীয় নেতৃত্বে জলবায়ু কার্যক্রম, ম্যানগ্রোভ বন পুনরুদ্ধার এবং টেকসই কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থার রূপান্তরে লিডার্সের অর্জিত অভিজ্ঞতা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরাই এ অংশগ্রহণের অন্যতম লক্ষ্য।
সম্মেলনের মূল প্রাঙ্গণে আগামী ৯ থেকে ১৪ নভেম্বর পর্যন্ত প্রদর্শনী বুথ নম্বর ২০-এ লিডার্সের বিভিন্ন কার্যক্রম, উদ্ভাবনী উদ্যোগ, স্থানীয় পর্যায়ের অভিযোজন মডেল ও অর্জিত অভিজ্ঞতা প্রদর্শন করা হবে। এর মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি, উন্নয়ন সহযোগী, গবেষক, নীতিনির্ধারক এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময়ের সুযোগ তৈরি হবে।
সম্মেলনে লিডার্সের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশগ্রহণ হচ্ছে জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশনের (ইউএনএফসিসিসি) আনুষ্ঠানিক পার্শ্ব-আয়োজনে।
আগামী ১৮ নভেম্বর সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিট থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত জেরজেভান-এর পার্শ্ব-আয়োজন কক্ষ ৩-এ ‘কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থার রূপান্তর’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা সিজিআইএআর, সলিডারিডাড এবং লিডার্স যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করছে। এতে লিডার্সের নির্বাহী পরিচালক মোহন কুমার মণ্ডল আলোচক হিসেবে অংশ নেবেন।
আলোচনায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থার রূপান্তর, টেকসই কৃষি, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অভিযোজন এবং সবার জন্য খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।
এ ছাড়া আগামী ১৯ নভেম্বর সকাল ১০টা ৩০ মিনিটে বাংলাদেশ প্যাভিলিয়নে ‘স্থানীয় নেতৃত্বে অভিযোজন কার্যক্রম: জনগোষ্ঠীর অগ্রাধিকারের সঙ্গে নীতি ও অর্থায়নের সংযোগ’ শীর্ষক বিশেষ আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে।
লিডার্স, ন্যাকম, আইসিআইএমওডি এবং বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করছে। এতে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর চাহিদা ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নীতি, পরিকল্পনা এবং জলবায়ু অর্থায়নের কার্যকর সংযোগ প্রতিষ্ঠার বিষয়টি গুরুত্ব পাবে।
সম্মেলন চলাকালে লিডার্সের প্রতিনিধিদল বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থা, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করবে। এসব বৈঠকের মাধ্যমে জলবায়ু অভিযোজন, পানি ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, ম্যানগ্রোভ বন পুনরুদ্ধার, সমুদ্র ও উপকূলীয় পরিবেশের কার্বন সংরক্ষণ, টেকসই জীবিকা এবং স্থানীয় পর্যায়ে জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধিতে যৌথ উদ্যোগ ও ভবিষ্যৎ সহযোগিতার সম্ভাবনা অনুসন্ধান করা হবে।
উল্লেখ্য, লিডার্স দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলের জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন, নিরাপদ পানির ব্যবস্থা, টেকসই জীবিকা, পরিবেশ সংরক্ষণ, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস এবং স্থানীয় পর্যায়ে অভিযোজন কার্যক্রম বাস্তবায়নে কাজ করে আসছে। পানি খাতে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ সংস্থাটি ২০২৩ সালে মর্যাদাপূর্ণ জায়েদ সাসটেইনেবিলিটি পুরস্কার অর্জন করে।
এ বিষয়ে লিডার্সের নির্বাহী পরিচালক মোহন কুমার মণ্ডল বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি অনুভব করেন উপকূলীয় ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ। অথচ জলবায়ু নীতি ও অর্থায়ন বিষয়ে আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় তাঁদের অভিজ্ঞতা ও অগ্রাধিকার সবসময় যথাযথ গুরুত্ব পায় না। আমরা কপ-৩১ সম্মেলনে বাংলাদেশের উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর বাস্তব অভিজ্ঞতা, স্থানীয় পর্যায়ের অভিযোজন উদ্যোগ এবং জলবায়ু ন্যায়বিচারের দাবি তুলে ধরতে চাই। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা আন্তর্জাতিক অংশীজনদের সঙ্গে বিনিময় এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরি করতে চাই।”
লিডার্সের প্রত্যাশা, কপ-৩১ সম্মেলনে তাদের এ অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশের উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বর আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনায় আরও জোরালোভাবে তুলে ধরা সম্ভব হবে। পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে বাস্তবায়িত কার্যকর অভিযোজন উদ্যোগগুলোকে বৈশ্বিক সহযোগিতা ও জলবায়ু অর্থায়নের সঙ্গে যুক্ত করার নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।
Leave a Reply