আল-হুদা মালী শ্যামনগর (সাতক্ষীরা) থেকে।
এক সময় গ্রামবাংলার প্রতিটি সকাল শুরু হতো কাকের পরিচিত ডাক দিয়ে। বাড়ির আঙিনা, গাছের ডাল, হাট-বাজার কিংবা ফসলের মাঠ সবখানেই ছিল কাকের অবাধ বিচরণ। কিন্তু সাম্প্রতিক বছর গুলোতে গ্রামাঞ্চলে কাকের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।
শ্যামনগর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে গ্রামাঞ্চলে ঘুরে জানা যায়, আগে প্রতিদিন অসংখ্য কাক দেখা যেত, এখন দু-একটি কাকও চোখে পড়ে না। বিষয়টি পরিবেশবীদদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
শ্যামনগর পরিবেশ কর্মী হাফিজ জানান, কাকের সংখ্যা কমে যাওয়ার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। নির্বিচারে গাছ কাটা, প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংস, কৃষিজমিতে অতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহার এবং দ্রুত নগরায়নের ফলে কাকের নিরাপদ বসবাস ও খাদ্য সংগ্রহের পরিবেশ সংকুচিত হচ্ছে। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, জলাবদ্ধতা এবং খাদ্যের উৎস কমে যাওয়াও এ পাখিটির অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার জনবসতি ও গ্রামীণ এলাকায় আগের তুলনায় কাকের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে বলে স্থানীয়দের মধ্যেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
গাবুরা ইউনিয়নের ৯নং সোরা গ্রামের আলহাজ্ব মুনছুর মালী বলেন, কয়েক বছর আগেও গ্রামের বড় বড় গাছে শত শত কাকের বাসা দেখা যেত। এখন সেই গাছগুলো কেটে ফেলা হয়েছে কিংবা বসতি ও অবকাঠামো নির্মাণের কারণে তাদের নিরাপদ আবাসস্থল হারিয়ে গেছে।
উপকূলীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি আব্দুল হালিম জানান, কাকের সংখ্যা হ্রাস কেবল একটি পাখির বিলুপ্তির ঝুঁকি নয়, বরং এটি পরিবেশগত পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে আরও অনেক পরিচিত পাখি ও প্রাণী হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কাক প্রকৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচ্ছন্নতাকর্মী। মৃত প্রাণী, পচনশীল খাদ্য ও বিভিন্ন ধরনের জৈব বর্জ্য খেয়ে তারা পরিবেশকে পরিষ্কার রাখতে সহায়তা করে। ফলে কাকের সংখ্যা কমে গেলে পরিবেশের স্বাভাবিক ভারসাম্যও হুমকির মুখে পড়তে পারে। কাকসহ অন্যান্য পাখির আবাসস্থল সংরক্ষণ, গাছ লাগানো, কীটনাশকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশবান্ধব সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তাদের মতে, প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় কাকের মতো সাধারণ পাখিগুলোর অস্তিত্বও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গ্রামবাংলার আকাশে কাকের সংখ্যা কমে যাওয়া তাই শুধু একটি পাখির অনুপস্থিতি নয়; এটি পরিবেশের গভীরে লুকিয়ে থাকা সংকটেরই এক নীরব বার্তা।
Leave a Reply