বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনকেন্দ্রিক লোকালয় এবং নদীপথগুলোতে ফের শুরু হয়েছে বনদস্যুদের ভয়াল তৎপরতা। জলদস্যু ও বনদস্যু মুক্ত সুন্দরবনের যে স্বস্তি বিগত কয়েক বছর ধরে বজায় ছিল, সাম্প্রতিক সময়ে অপহণ, চাঁদাবাজি এবং একের পর এক হামলার ঘটনায় সেই শান্ত পরিবেশ রূপ নিয়েছে আতঙ্কে। দ্রুত সময়ের মধ্যে সুন্দরবন থেকে বনদস্যু পুরোপুরি নির্মূল করা না হলে বাপ-দাদার ভিটে ও পেশা ছেড়ে অন্য কোথাও পাড়ি জমানো ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না বলে চরম হাহাকার প্রকাশ করেছেন উপকূলীয় জেলে, বাওয়ালি ও মৎস্যজীবীরা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বঙ্গোপসাগর ও সুন্দরবনের বিভিন্ন নদী-খালে মাছ ও কাঁকড়া ধরতে গিয়ে প্রায় প্রতিদিনই ডাকাত দলের কবলে পড়ছেন সাধারণ জেলেরা। বনের গভীরে বিভিন্ন ডাকাত দল অস্ত্রের মুখে জেলেদের অপহণ করে গহিন অরণ্যে নিয়ে যাচ্ছে।
নির্ধারিত চাদা বা মুক্তিপণ না দিলে মিলে না মুক্তি; অমানুষিক নির্যাতনের পাশাপাশি প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হচ্ছে। বিগত কয়েক মাসে অসংখ্য জেলের পরিবার চড়া সুদে ঋণ নিয়ে বা গবাদিপশু বিক্রি করে দস্যুদের মুক্তিপণ মেটাতে বাধ্য হয়েছেন।
সুন্দরবন অঞ্চলের অর্থনীতি সম্পূর্ণভাবে বনজ সম্পদ ও মৎস্য আহরণের ওপর নির্ভরশীল। বাওয়ালি জেলে সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে সুন্দরবনই জীবন ও জীবিকার প্রধান উৎস।
ভুক্তভোগী এক জেলে আক্ষেপ করে বলেন, “মহাজনের কাছ থেকে দাদন ও সমিতি থেকে ঋণ নিয়ে নৌকার সাজসরঞ্জাম কিনে নদীতে নামি। দস্যুদের উৎপাতে এখন বনে যাওয়া মানে মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়া। এভাবে চলতে থাকলে পরিবার নিয়ে না খেয়ে মরা ছাড়া আর পথ থাকবে না। এলাকা ছেড়ে অন্য কোথাও দিনমজুরি করতে যাওয়া ছাড়া কোনো উপায় দেখছি না।”
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও কোস্ট গার্ড মাঝেমধ্যে অভিযান চালালেও দস্যুদের ভৌগোলিক অবস্থান ও বনের গহিন আড়ালের সুযোগে পুরোপুরি দস্যুমুক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে উপকূলের সচেতন মহল ও সর্বস্তরের ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ সুন্দরবনে নিয়মিত ও জোরদার যৌথ অভিযান পরিচালনার দাবি জানিয়েছেন।
সুন্দরবনের উপর নির্ভরশীল হাজার হাজার মানুষের একমাত্র দাবি—অবিলম্বে আধুনিক প্রযুক্তি ও শক্তিশালী টহলের মাধ্যমে সুন্দরবনকে পুনরায় স্থায়ীভাবে দস্যুমুক্ত ঘোষণা করা হোক। অন্যথায় এই জনপদের একটি বড় অংশ মারাত্মক অর্থনৈতিক বিপর্যয় এবং বাস্তুচ্যুতির মুখে পড়বে।
Leave a Reply