এম এ হালিমঃ
সাতক্ষীরার উপকূলীয় জনপদ শ্যামনগরসহ বিভিন্ন এলাকায় মৎস্য ও কাঁকড়া ঘেরের রাস্তার দুই পাশ এবং ঘেরের আইলে এখন দেখা মিলছে নানা ধরনের সবজির চাষ। একসময় এসব জায়গা অনেকটাই অনাবাদি পড়ে থাকলেও বর্তমানে স্থানীয় কৃষক ও ঘের মালিকরা সেই জমি কাজে লাগিয়ে লাউ, কুমড়া, করলা, বরবটি, শসা, চিচিঙ্গা, ধুন্দল, ঢেঁড়শ, পুঁইশাকসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি উৎপাদন করছেন।
সরেজমিনে উপকূলের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, মৎস্য ও কাঁকড়া ঘেরের চারপাশের উঁচু রাস্তা ও আইলে সারি সারি সবজির গাছ। কোথাও বাঁশের তৈরি মাচায় লাউ, কুমড়া ও চিচিঙ্গা ঝুলছে, আবার কোথাও মাটিতে বিছিয়ে রয়েছে শসা, বরবটি ও অন্যান্য সবজির গাছ। ঘেরের পানিতে মাছ-কাঁকড়া চাষের পাশাপাশি রাস্তার দুই পাশে সবজি চাষ করে একই জায়গা থেকে বাড়তি আয় করছেন অনেক পরিবার।
স্থানীয় চাষিরা জানান, উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততার কারণে কৃষিজমিতে সারা বছর সবজি চাষ করা কঠিন। তবে ঘেরের রাস্তা ও উঁচু আইলে মাটি তুলে জৈব সার প্রয়োগ করে তুলনামূলকভাবে সহজে সবজি চাষ করা যায়। এতে আলাদা করে বেশি জমির প্রয়োজন হয় না। ঘেরের রাস্তার অব্যবহৃত জায়গা কাজে লাগিয়ে পরিবারের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বাজারে বিক্রি করে বাড়তি অর্থও পাওয়া যাচ্ছে।
বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টির পানিতে অনেক এলাকায় মাটির লবণাক্ততা কিছুটা কমে আসায় সবজি চাষের সুযোগ তৈরি হয়। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, শ্যামনগরে চলতি মৌসুমে ঘেরের আইলে ব্যাপকভাবে সবজি চাষ হচ্ছে এবং ঘেরের আইলে সবজি উৎপাদনের পরিমাণও উল্লেখযোগ্য।
শ্যামনগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. ওয়ালিউল ইসলাম বলেন, ঘেরের রাস্তা ও আইলের অব্যবহৃত জায়গায় পরিকল্পিতভাবে সবজি চাষ করলে একই জমি থেকে কৃষকরা বাড়তি আয় করতে পারেন। উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা সহনশীল সবজির চাষ বাড়ানো গেলে কৃষকের পুষ্টি ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তায় এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
কৃষকদের ঘেরের পাড়ে সবজি চাষে উৎসাহিত করছেন কি না জানতে চাইলে কৃষিবিদ ওয়ালিউল ইসলাম বলেন, আমরা উপজেলা কৃষি অধিদপ্তর থেকে প্রতিনিয়ত কৃষকদের সাথে পরামর্শ করে এবং তাদের পতিত জায়গায় বিভিন্ন সবজি চাষ করতে উদ্বুদ্ধ করছি এবং প্রতিটি মুহূর্ত কৃষকদের সাথে আমাদের অফিস স্টাফ সহ আমি যোগাযোগ রেখেছি কোথাও কোন কৃষকের কোন সমস্যা থাকলে সাথে সাথে পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করার চেষ্টা করছি ।
কৃষিবিদ মো. ওয়ালিউল ইসলাম প্রতিবেদককে জানান, শ্যামনগরে ২০২৬ অর্থ বছরে ১৫০০ হেক্টর জমিতে কৃষি চাষ হচ্ছে।
এতে একদিকে পরিবারের পুষ্টির চাহিদা পূরণ হচ্ছে, অন্যদিকে বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছেন তিনি।
শুক্রবার(২১ আগস্ট) সকালে সরজমিনে দেখাযায় শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী পানখালি, হরিনগর, নীলডুমুর এলাকার বেশ কিছু ঘেরের পতিত জায়গায় সবজি চাষ করা হচ্ছে, এ বিষয়ে স্থানীয় কৃষকদের কাছে জানতে চাইলে। পানখালী গ্রামের কৃষানী ,কনিকা রানী ও হরিনগর গ্রামের শরমা রানী বলেন,ঘেরের রাস্তার দুই পাশ আগে তেমন কোনো কাজে লাগত না। এখন সেখানে সবজি লাগিয়েছি। পরিবারের সবজির চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি অতিরিক্ত সবজি বাজারে বিক্রি করে কিছু আয়ও হচ্ছে।”
নীলডুমুর এলাকার মনজুরা খাতুন, জানান, মাছ বা কাঁকড়া চাষের পাশাপাশি ঘেরের রাস্তা ও আইল ব্যবহার করে সবজি উৎপাদন করলে একই জায়গা থেকে দুই ধরনের আয় করা সম্ভব। এতে ঘেরের রাস্তা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার পাশাপাশি জায়গাটিও উৎপাদনশীল হয়ে ওঠে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বার্ষিকের উপজেলা সমন্বয়কারী রামকৃষ্ণ জোয়ারদার বলেন উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা, অতিবৃষ্টি ও বাজারজাতকরণ এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শ্যামনগরসহ উপকূলীয় এলাকায় জলাবদ্ধতার কারণে ফসল ও সবজি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।তাই উপকূলে মৎস্য ও কাকড়া চাষ এলাকায় পানি সরবরাহ নিয়ম মত রাখতে হবে তাহলে কোন ভাবেই কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না। রামকৃষ্ণ আরো বলেন, ঘেরের রাস্তা ও আইলে পরিকল্পিতভাবে সবজি চাষ বাড়ানো গেলে একদিকে পতিত জায়গার সর্বোচ্চ ব্যবহার হবে, অন্যদিকে উপকূলের মানুষের আয় ও পুষ্টি নিরাপত্তায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি লবণসহিষ্ণু সবজির জাত, জৈব সার ব্যবহার, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং সঠিক পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা গেলে এ উদ্যোগ আরও সফল হতে পারে।
তবে উপকূলের লবণাক্ত পরিবেশ ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও মৎস্য-কাঁকড়া ঘেরের রাস্তার দুই পাশে সবুজ সবজির সমারোহ এখন স্থানীয় মানুষের জন্য নতুন সম্ভাবনার বার্তা দিচ্ছে। মাছ-কাঁকড়ার পাশাপাশি সবজি উৎপাদনের এই সমন্বিত চাষাবাদ ভবিষ্যতে উপকূলের কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
Leave a Reply